চুলের যত্নে মেহেদী

হাত রাঙাতে যেমন মেহেদী কার্যকরী ঠিক তেমনি চুলের যত্নেও মেহেদী আদর্শ ভূমিকা পালন করে থাকে। নতুন চুল গজাতে, চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে, চুল রাঙাতে, খুশকি দূর করতে এবং চমৎকার স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল পেতে মেহেদী অত্যন্ত কার্যকরী। গাছের পাতা মেহেদী ছাড়াও এখন ঝামেলা এড়াতে গুঁড়ো মেহেদী কিনে ব্যবহার করতে পারেন।

চলুন জেনে নেওয়া যাক চুলের যত্নে কিভাবে মেহেদী ব্যবহার করতে পারবেনঃ

নতুন চুল গজাতেঃ

১. নতুন চুল গজাতেঃ চুলের ঘনত্ব বাড়াতে চাইলে শতভাগ আস্থা রাখতে পারেন মেহেদীর ওপর। ঘনকালো চুল পেতেও মেহেদী সাহায্য করে থাকে। ১ কাপ বাটা মেহেদীর সাথে ২ চা চামচ নারিকেল তেল ও সমপরিমাণ টকদই মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই হেয়ার প্যাকটি ১ ঘন্টা রেখে চুল ধুয়ে ফেলুন। সুন্দর ঘন কালো চুল পেতে মাসে অন্তত দুইদিন ব্যবহার করুন।

২. রুক্ষতা দূর করতেঃ ১ কাপ পরিমাণ বাটা মেহেদীর সাথে ১ টি ভিটামিন ই ক্যাপসুল ও ২ চা চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি চুলে লাগিয়ে ১ ঘন্টা রেখে শ্যাম্পু করে ফেলুন। চুলের রুক্ষতা কমাতে ও চুলের আগা ফাঁটা রোধ করতে এই প্যাকটি বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

৩. চুল রাঙাতেঃ অনেকেরই হরমোনাল সমস্যার কারণে অল্প বয়সে চুল পেকে যায়। নিয়মিত মেহেদী ব্যবহার করলে এই সাদাটে ভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। প্রথমে এক কাপ ফুটন্ত পানিতে ২ চা আমলকী গুঁড়ো, ১ চা চামচ রঙ চা ও দুটো লবঙ্গ এবং পরিমাণ মতো মেহেদী বাটা দিয়ে ঘন প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি চুলে লাগিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। পাকা চুলের সমস্যা মিলিয়ে যাবে।

চুলের  মেহেদী

৪. খুশকি সমস্যা কমাতেঃ সবারই কমবেশি খুশকির মতো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এ জাতীয় সমস্যা মোকাবিলায় মেহেদীর সাহায্যে চটজলদি তৈরি করতে পারেন হেয়ার প্যাক। আগের রাতে মেথি ভিজিয়ে রেখে পরদিন বেটে নিন। সরিষার তেল গরম করে তাতে কয়েকটি মেহেদী পাতা ছেড়ে দিন৷ তেল ঠান্ডা হয়ে এলে বাটা মেথি মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই হেয়ার প্যাকটি মাথার ত্বকে লাগিয়ে ঘন্টা দুয়েক পরে শ্যাম্পু করে ফেলুন। খুশকি সমস্যা কমাতে এই প্যাকটি বেশ কার্যকরী।

পুরুষদের ত্বকের যত্নে যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ

নারীদের ত্বক তুলনামূলকভাবে পাতলা হয়ে থাকে তাই দ্রুত বয়সের ছাপ পড়ে যায়। অন্যদিকে পুরুষের ত্বক কিছুটা পুরু হয়ে থাকে যা ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে বাঁধা দেয়। তাই বলে ত্বকের যত্নে অবহেলা করলে তো চলবে না!

ত্বকের যত্নের ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে সে বিষয়গুলো হলোঃ

পুরুষদের ত্বকের যত্নে

১.ত্বকের ধরণ জানাঃ প্রথমেই যে বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে তা হলো আপনার ত্বকের ধরন কেমন। আপনার ত্বক রুক্ষ নাকি তৈলাক্ত সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। প্রয়োজনে পরীক্ষা করতে থাই টিস্যু ব্যবহার করে দেখতে পারেন।

২. ত্বক পরিষ্কার রাখুনঃ অনেকেই ত্বক পরিষ্কার রাখতে সাবান অথবা শুধুমাত্র পানি ব্যবহার করে থাকেন। তবে সাবান ত্বককে রুক্ষ করে দেয়। তাই সাবানের পরিবর্তে ত্বকের ধরন বুঝে ফেসওয়াশ বেছে নিন। বাইরে থেকে এসে অবশ্যই ত্বক পরিষ্কার করবেন এতে ত্বকে ময়লা জমবে না।

৩. ময়েশ্চারাইজিংঃ পুরুষদের ত্বক সাধারণত তৈলাক্ত হয়ে থাকে। তাই ত্বক পরিষ্কার করার পরে ত্বকে ময়েশ্চারাইজার হিসেবেপুরুষদের ত্বকের যত্নে কোনো ক্রিম অথবা বডি লোশন ব্যবহার করতে পারেন। এতে ত্বকের শুষ্কতা দূর হবে। শীতকালে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করলে ত্বকের শুষ্কতা আরও বেশি হতে পারে। তাই শীতকালে ত্বককে ময়েশ্চারাইজ করুন।

৪. সানব্লক ব্যবহার করুনঃ সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে সানব্লক ক্রিম ব্যবহার করুন। ত্বকের যত্নে সানব্লক দারুণ ভূমিকা রাখে। এতে ত্বকে রোদে পোড়া ভাব দেখা দেয় না।

৫. শেভঃ পুরুষদের প্রতিনিয়ত শেভ করতে হয়। অসাবধানতাবশত প্রায়ই গাল কেটে যায় এক্ষেত্রে সাবধানী হতে হবে এবং পুরুষদের চুলের কয়েকটি কার্যকরী হেয়ার প্যাকউন্নতমানের শেভিং ক্রিম ও রেজার ব্যবহার করতে হবে। তাহলে ত্বক কাটাছেঁড়া হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কমে যাবে।

৬. চুলের যত্নঃ নিয়মিত চুলের যত্ন নিতে হবে কেননা চুলই সবচেয়ে বেশি মানুষকে আকর্ষিত করে। অতিরিক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করা যাবে না আবার তেল চিটচিটে ভাবটাও যাতে চুলে না আসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সবকিছুই পরিমিত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে তবেই চুলের সঠিক যত্ন নিশ্চিত হবে।

৭. এক্সফলিয়েশনঃ ত্বকে জমে থাকা ময়লা থেকেই সৃষ্টি হয় ব্লাকহেডসের। এছাড়া মৃত কোষের যে স্তর সেসব দূর করতেও এক্সফলিয়েশন করা জরুরি। সবসময় চেষ্টা করবেন বেশি বেশি পান করার। তাহলে ত্বকের অধিকাংশ সমস্যার সঠিক সমাধান পেয়ে যাবেন।

পুরুষদের চুলের কয়েকটি কার্যকরী হেয়ার প্যাক

নারী পুরুষ উভয়ের ত্বক ও চুলের যত্ন নোওয়া উচিৎ। তবে রূপচর্চার কথা উঠলে শুধু নারীরাই সে ব্যাপারে আকর্ষণ অনুভব করে থাকে। অথচ উভয়েরই সমানভাবে রূপচর্চা করা উচিৎ।

আসুন জেনে নেই চুলের যত্নে কিছু হেয়ার প্যাক সম্পর্কেঃ

চুল ও ত্বকের যত্নে জয়তুন তেল

১. আমলকি ও মেহেদীর হেয়ার প্যাকঃ আমলকী ও মেহেদী পাটায় বেঁটে নিন। বাটার সময় পানির পরিবর্তে দুধ ব্যবহার করুন। এবার দুটি উপাকরণ একসাথে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই হেয়ার প্যাকটি গোসলের ১ ঘন্টা আগে পুরো চুলে লাগিয়ে এরপর শ্যাম্পু করে ফেলুন। আপনার চুল যদি পাতলা হয়ে আসে তবে এই হেয়ার প্যাকটি ব্যবহার করে দেখতে পারেন ভালো ফল পাবেন।

২. পেঁয়াজের রস ও আমলকীর হেয়ার প্যাকঃ প্রথমে পেঁয়াজ ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে রস বের করে নিন এরপর তাতে আমলকীর রস মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি মাথার ত্বকে লাগিয়ে ঘন্টাখানেক পরে শ্যাম্পু করে ফেলুন। চুল পড়া রোধে এবং নতুন চুল গজাতে এই প্যাকটি এককথায় আদর্শ।

৩. ডিমের হেয়ার প্যাকঃ একটি ডিমের সাদা অংশের সাথে ১ চা চামচ মধু, লেবু এবং অলিভ অয়েল মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এবার প্যাকটি ৩০ মিনিট মতো চুলে লাগিয়ে রেখে তারপর শ্যাম্পু করে ফেলুন। এই প্যাক ব্যবহারের ফলে আপনার চুল হয়ে উঠবে উজ্জ্বল ও সজীব।

৪. পাকা কলার হেয়ার প্যাকঃ একটি পাকা কলার সাথে ১ চা চামচ লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি না শুকানো পর্যন্ত চুলে লাগিয়ে রাখুন৷ শুকিয়ে গেলে শ্যাম্পু করে ফেলুন। এই হেয়ার প্যাকটি নিয়মিত ব্যবহারের ফলে আপনার চুলেরমেথি, টকদই ও নারিকেল তেল যে রুক্ষ ভাব সেটা ধীরে ধীরে কমে যাবে।

৫. মেথি ও টকদই এর হেয়ার প্যাকঃ যেদিন এই হেয়ার প্যাকটি ব্যবহার করবেন তার আগের রাতে মেথি ভিজিয়ে রাখুন। সকালে মেথি বেটে তাতে পরিমাণ মতো টকদই মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি চুলে লাগিয়ে না শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। শুকিয়ে গেলে শ্যাম্পু করে ফেলুন। এই হেয়ার প্যাকটি চুলকে নরম এবং উজ্জ্বল করতে সাহায্য করবে।

ব্রণের সমস্যার ঘরোয়া কয়েকটি প্যাক

ব্রণের প্রকোপ বয়ঃসন্ধিকালে বেশি হয়। মূলত তখন এ সমস্যা শুরু হয় এবং অনেকের ক্ষেত্রে তা চলমান থাকে। ব্রণের দাগ, ক্ষত স্বাভাবিক অভিব্যক্তিকে ক্ষুন্ন করে। গরমে এ সমস্যা আরও প্রকোট হয়।

আসুন জেনে নেওয়া যাক ব্রণের সমস্যা থেকে মুক্তির কয়েকটি কার্যকরী ঘরোয়া প্যাক সম্পর্কেঃ

১. ব্রনের দাগ দূর করতে মধু অত্যন্ত কার্যকারি একটি উপাদান। ঘুমাতে যাওয়ার আগে মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে মধু লাগান। সারারাত রেখে সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

ব্রণের সমস্যার ঘরোয়া প্যাক

২. ব্রণের দাগ আমাদেরকে চিন্তায় রাখে। মধুর সাথে দারুচিনি গুঁড়ো মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি শুধুমাত্র দাগের উপর লাগিয়ে ঘন্টাখানেক পরে ধুয়ে ফেলুন। সারারাতও রাখতে পারেন। খেয়াল করলে দেখবেন কিছুদিনের মধ্যেই আপনার মুখের দাগ দূর কমে গেছে।

৩. দিনে অন্তত দুইবার অ্যালোভেরা জেল মুখে লাগান এবং মিনিট তিরিশেক পরে ধুয়ে ফেলুন। এটি শুধুমাত্র ব্রণের দাগই দূর করবে না, বরং আপনার ত্বকের ঔজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে এবং ত্বককে করবে টানটান।

৪. একটি লাল টমেটো ব্লেড করে রস বের করে নিন। এরপর তা শশার রসের সাথে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এই প্যাকটি মুখে লাগান। মিনিট ১৫ পরে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২/৩ দিন এই প্যাকটি লাগান। ব্রণের দাগ তো দূর হবেই, সেই সাথে রোদে পোড়া দাগব্রণের সমস্যার দূর হয়ে ত্বক হয়ে উঠবে নরম ও উজ্জ্বল।

৫. লেবুকে বলা হয় প্রাকৃতিক ব্লিচ। লেবুর রসের সাথে অল্প পরিমাণ পানি ও গোলাপ জল মিশিয়ে একটি তুলার বলের সাহায্যে তা মুখে ৩-৪ মিনিট ঘষুন। যদি সম্ভব হয় তবে ১ চা চামচ লেবুর রসের সাথে ২ চা চামচ ই ক্যাপসুল মিশিয়ে ত্বকে লাগাতে পারেন। ভিটামিন ই ক্যাপসুল ত্বকের জন্য বেশ কার্যকরী।

৬. ১ চা চামচ লেবুর রস, ১ চা চামচ মধু, ১ চা চামচ বাদাম তেল, ২ চা চামচ দুধ একসাথে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। একটানা কয়েকদিন এই ফেস প্যাকটি ব্যবহার করতে পারেন।

টিপসঃ তবে ব্রণ থাকা অবস্থায় দুধ ব্যবহার করবেন না।